কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় সামাজিক সালিশে যুক্ত থাকার ক্ষোভ থেকে মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষক মো. গোলাম রসুল মজুমদার লিটনকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনার দীর্ঘ দুই বছর পর পুনঃতদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
মামলার প্রধান আসামি সাফায়াত আলী ওরফে সাফু (৩৫) রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। শুক্রবার (১৯ জুন) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক দিদারুল ফেরদাউস এবং পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. মতিয়ার রহমান সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মামলার অভিযোগ ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নিহত গোলাম রসুল মজুমদার লিটন সদর দক্ষিণ উপজেলার গলিয়ারা দক্ষিণ ইউনিয়নের নলকুড়ি গ্রামের মৃত তফাজ্জল হোসেনের ছেলে এবং স্থানীয় নলকুড়ি ফোরকানিয়া মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন।
২০২৪ সালের ৬ মার্চ মাদরাসায় পাঠদানরত অবস্থায় একই গ্রামের শাহ আলমের ছেলে সাফায়াত আলী শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পেছন থেকে ধারালো দা দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে শিক্ষক লিটনকে হত্যা করে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয় লোকজন ধাওয়া করে পাশের গ্রাম থেকে তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মাহমুদা হেলেন চৌধুরী বাদী হয়ে সাফায়াত আলী, তার বড় ভাই কেরামত আলীসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশ সাফায়াতকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সে সময় তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। পরবর্তীতে পুলিশ শুধু সাফায়াতের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
তবে তদন্তে হত্যার প্রকৃত কারণ ও অপর আসামিদের সম্পৃক্ততা স্পষ্ট না হওয়ায় মামলার বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা দিদারুল ফেরদাউস জানান, আদালতের অনুমতিতে কারাগার থেকে এক দিনের রিমান্ডে এনে সাফায়াত আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেন এবং পরদিন বৃহস্পতিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি একাই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
পিবিআই কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. মতিয়ার রহমান জানান, সাফায়াত আলী একসময় সিঙ্গাপুর প্রবাসী ছিলেন। দেশে ফিরে বিয়ে করলেও পরে তিনি মারাত্মকভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। মাদকের কারণে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে না পারায় স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর নিজের ভাইয়ের কাছে জমি বিক্রি করে তিনি আর্থিকভাবে নিঃস্ব ও মানসিকভাবে চরম হতাশ হয়ে পড়েন।
তিনি আরও জানান, এসব পারিবারিক বিষয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বিচারে অংশ নিয়েছিলেন প্রতিবেশী মাদরাসা শিক্ষক গোলাম রসুল মজুমদার লিটন। ওই সালিশ এবং অন্যান্য সামাজিক বিষয় নিয়ে শিক্ষকের ওপর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জন্মায় সাফায়াতের। সেই ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পিতভাবে মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে ঢুকে শিক্ষক লিটনকে কুপিয়ে হত্যা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।































আপনার মতামত লিখুন :