binodonerpadmaful
ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২

জুলাই সনদ আদেশ অবৈধ, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল


বিনোদনের পদ্মফুল | নিজস্ব প্রতিবেদক এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৯:১৭ এএম জুলাই সনদ আদেশ অবৈধ, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারিকৃত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে সরকারি দল বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল ও জাতীয় প্রতারণা। এই আদেশের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এটি সূচনা থেকেই অবৈধ।’
কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমানের আনা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ (আদেশ নং ০১, ২০২৫) এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে জরুরি জনগুরুত্ব বিষয়ে আলোচনা’ শীর্ষক মুলতবি প্রস্তাবের ওপর গতকাল মঙ্গলবার সংসদে পূর্বনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একথা বলেন।
পরে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত প্রস্তাব তুলে ধরে সালাহ উদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, ‘আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে জনপ্রত্যাশিত একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।’ আলোচনা শেষে তার এই প্রস্তাবটি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়।
গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিল জাতীয় সংসদ। এটি গৃহীত হওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কমিটিতে সরকারি দলের, বিরোধী দলের ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য থাকবেন। প্রয়োজনে এবিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও কমিটিতে থাকতে পারেন। অন্যদিকে, মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনকারী ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বিশেষ কমিটিতে যেন সরকারি ও বিরোধীদল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য রাখা হয় সেই প্রস্তাব দিয়েছেন।
মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তহীন একটি প্রতারণার দলিল। এটি আমি আজকে আবার পুনরুচ্চারণ করছি। রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) এই আদেশে উল্লেখ না করে এটি জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি জাতীয় প্রতারণা।
আদেশের আইনি দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা ছিল না। তাহলে রাষ্ট্রপতি এই আদেশ জারি করলেন কীভাবে? যেই আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সেই আদেশ লিগ্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা সূচনা থেকেই বাতিল। এটি অধ্যাদেশও নয়, আইনও নয়।
গণভোটের ব্যালট নিয়ে সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এটি তো কলার ভেতরে তিতা ওষুধ ঢুকিয়ে জোর করে খাওয়ানোর মতো অবস্থা। কোনো আইনকে আপনি জাতিকে এভাবে বাধ্য করে খাওয়াতে পারেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মৌলিক কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়া প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফর্ম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। তিনি সংবিধান সংরক্ষণের শপথ নিয়ে নিজেই তা ভঙ্গ করেছেন।
বিএনপির দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, সারাদেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। কিন্তু, আমরা ঐতিহাসিকভাবে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য ধারণ করি। আমরা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলের ভিত্তিতে সংস্কার চাই, কোনো অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে নয়। দেশের জনগণ বিএনপিকে ৫১ শতাংশ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে।
দেশের ইতিহাসে বারবার জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও হত্যা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর সূচনা বক্তব্যে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।
তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে কোনো রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশপরম্পরায় শাসনেরও ব্যবস্থা থাকে না। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও বারবার জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনো কোনো  ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে যারা সুযোগ  পেয়েছিলেন, তারাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোনো মূল্যায়ন ছিল না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৪) কড়া সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচ্ল দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়ে ত্লাব চালানো হয়েছে। এসময় তিনি গুম-খুনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনো আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা্লরে শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি। এছাড়া রাষ্ট্রের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, (আওয়ামী লীগের) এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে। এই জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়; কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুর সবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহিদ হয়েছে।
আলোচ্য ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপরে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে।
বিরোধীদলীয় নেতা আরো বলেন, এই আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।
সংবিধান ছুড়ে ফেলার সমালোচনা করে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবিধান ছুড়ে ফেলব কেন। এই সংবিধানে এত গাত্রদাহ কেন। সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল?
পার্থ বলেন, জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেন- এটা আসলে হয় না।
সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা চাইলে তো সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারি। এর জন্য ছুড়ে ফেলার তো দরকার নেই। জামায়াতের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, সারাজীবন ভারতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে এখন তাদের সঙ্গে মিটিং করছেন। আবার সারাজীবন ইসলামের নামে রাজনীতি করে ভোটের জন্য শেষে এসে বলছেন আমরা শরিয়া আইন চাই না। প্রবলেম কী? আমার কথাগুলো একটু ম্যানুভার করেন। আপনারা পজিটিভ পলিটিক্স নিয়ে আসেন। কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা তেলের দাম নিয়ে কথা বললেও বলা হতো ওরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। এখন আমি সেই একই আচরণ দেখতে পাচ্ছি।
আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের জবাবে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, যারা কখনও কখনও কনফার্মিস্ট, কখনও কখনও রিফর্মিস্ট, তারা মূলত অপর্চুনিস্ট। আমি সংবিধানের কিছু কিছু ধারা মানবো, আর কিছু কিছু ধারা মানবো না। আমি কখনও কখনও সাংবিধানিক, কখনও কখনও অসাংবিধানিক।
তিনি বলেন, কিছুক্ষণ আগে আমাদের সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন তিনি যারা সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায় তাদেরকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে তুলনা করলেন। তখন ট্রেজারি বেঞ্চে সম্মানিত মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিলেন। মাননীয় স্পীকার, গণতন্ত্রের জন্য যিনি আপসহীন লড়াই করে গিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া...তিনি বলেছিলেন, যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন এই পার্লামেন্ট জনতার কাছে যাবে, সেদিন এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চে যারা...তারা দীর্ঘদিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। আজ তারা সংবিধান পরিবর্তনের প্রশ্নকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে এক করে  দেখার মাধ্যমে কী বেগম জিয়াকেই পরোক্ষভাবে অসম্মান করছেন না?
এনসিপির আখতার হোসেন বলেন, তারেক রহমান আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ৩০ জানুয়ারি রংপুরে আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন। তারা এখন এসে গণভোটের রায় মানতে কেন চান না, সেই প্রশ্নটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করতে চাই।

Side banner