বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় এখনো কম এবং জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় এই বাজেট আরও বাড়ানো জরুরি। কিন্তু এই আলোচনায় একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। সেটা হলো আমরা যে অর্থ বরাদ্দ করছি, তা কি সত্যিই মানুষের প্রয়োজনকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে বা সে অনুযায়ী বণ্টিত হচ্ছে?
স্বাস্থ্যের অর্থায়নের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে সম্পদ বরাদ্দের ভিত্তি হতে হবে ওই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, রোগের ঝুঁকি এবং সেবার চাহিদা। কিন্তু বাংলাদেশে সেবাকেন্দ্রগুলোর অর্থায়নের অর্থায়নের একটি বড় অংশ এখনও এমন একটি পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাজেট নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রশাসনিকভাবে এটি সহজ হলো ন্যায্যতা ও দক্ষতার বিচারে এই পদ্ধতি খুবই দুর্বল।
একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সমান বরাদ্দ মানেই ন্যায্য বরাদ্দ নয়। ন্যায্যতার অর্থ হলো, যার প্রয়োজন বেশি, তাকে বেশি বরাদ্দ দেওয়া। অথচ আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় দুটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সমান সংখ্যক শয্যা থাকলে তাদের বরাদ্দও প্রায় একই থাকে, যদিও দুটি উপজেলার স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্যের মাত্রা, রোগীর চাপ কিংবা দুর্যোগের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
ধরা যাক, একটি উপজেলা নিয়মিত বন্যা, নদীভাঙন বা ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে থাকে। বর্ষাকালে সেখানে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড় কিংবা আঘাতজনিত রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একই সময়ে অন্য একটি উপজেলা তুলনামূলকভাবে দুর্যোগমুক্ত থাকে বা সেখান হয়তো রোগীর চাপও কম। তবু উভয় প্রতিষ্ঠান প্রায় একই আর্থিক বরাদ্দ পায়। প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা কি জনগণের চাহিদাকে প্রতিফলিত করে?
এই প্রশ্ন শুধু ন্যায্যতার নয়; এর সাথে দক্ষতার বিষয়ও জড়িত। যেখানে রোগের প্রকোপ বেশি, সেখানে একই অর্থ দিয়ে বেশি মানুষকে সেবা দেওয়া যায়, বেশি জীবন রক্ষা করা যায় এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যয়ও কমানো যায়। অর্থাৎ সেখানে বেশি বরাদ্দ শুধু সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না; এটি সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহারও নিশ্চিত করে। অর্থাৎ একই টাকার উপযোগিতাও সেখানে বেশি।
উপকূল, চর, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল, বস্তি এবং সমতল এলাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি এক নয়। কোথাও দুর্যোগ প্রধান সমস্যা, কোথাও অপুষ্টি, কোথাও সংক্রামক রোগ, আবার কোথাও অসংক্রামক রোগ। কিন্তু বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র্যের খুব সামান্যই প্রতিফলন দেখা যায়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিবর্তনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ এবং নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় ফিক্সড এবং অনমনীয় বাজেট কাঠামো দিয়ে পরিবর্তনশীল চাহিদা মোকাবিলা করা কঠিন। ফলে সংকটের সময় সেবাকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম কিংবা জরুরি সেবার জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না, সঠিক সময়ে সঠিক সেবা দেওয়াও ব্যাহত হয়।
তাহলে বিকল্প কী?
একটি যৌক্তিক সমাধান হতে পারে এলাকার প্রয়োজনকে মাথায় রেখে বাজেট বরাদ্দ করা। এর অর্থ এই নয় যে বিদ্যমান কাঠামো সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। বরং শয্যা সংখ্যাকে একটি সূচক হিসেবে রেখে তার সঙ্গে এমন কিছু সূচক যুক্ত করতে হবে, যাতে ওই এলাকার বাস্তবতা ও প্রয়োজন প্রতিফলিত হয়।
প্রথমত, বিবেচনায় আসা উচিত দুর্যোগের ঝুঁকি। বাংলাদেশের কিছু উপজেলা প্রতিবছরই বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি হয়। এসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও স্বাভাবিকভাবেই বেশি। অতএব, স্বাস্থ্য বাজেটের একটি অংশ দুর্যোগকে মাথায় রেখে অতিরিক্ত বরাদ্দ হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ওই এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাধারণত চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করে, কারণ চিকিৎসার ব্যয় তাদের জন্য বড় বাধা। ফলে তারা যখন হাসপাতালে আসে, তখন রোগ অনেক বেশি জটিল পর্যায় পৌঁছে যায়। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যায়। কাজেই উচ্চ দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় তুলনামূলক বেশি বাজেট বরাদ্দ করা অর্থনৈতিকভাবেও যৌক্তিক।
তৃতীয়ত, রোগের মৌসুমি ধরন এবং স্থানীয় ডিজিজ বারডেন বা রোগের বোঝাও বাজেট বরাদ্দের নিয়ামক হওয়া উচিত। কিছু অঞ্চলে বর্ষাকালে ডায়রিয়া বাড়ে, কোথাও শীতকালে নিউমোনিয়া, কোথাও আবার নির্দিষ্ট সময় ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা এখন আগের তুলনায় অনেক উন্নত। এই তথ্য ব্যবহার করে আগাম পরিকল্পনা করা কঠিন নয়। সরকারর বিদ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমেই তা সম্ভব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস এই ধরনের তথ্য জোগাড় করে, কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই এই কাজ করা সম্ভব।
এই তিনটি উপাদান নিয়ে অর্থাৎ দুর্যোগ ঝুঁকি, আর্থসামাজিক অবস্থা এবং রোগের বোঝা একত্র করে একটি সূচক তৈরি করা সম্ভব। জাতীয় বাজেটের একটি অংশ এই সূচকের ভিত্তিতে বণ্টন করা হলে বরাদ্দ অনেক বেশি ন্যায্য ও কার্যকর হবে। এতে বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে ফেলারও প্রয়োজন হবে না; বরং সেটি আরও যৌক্তিক করা যাবে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে এই ধরনের নীতি অনুসরণ করছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বহু বছর ধরে এমন একটি বরাদ্দ পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যেখানে কেবল হাসপাতালের আকার নয়, বরং জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান, রোগের বোঝা এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থানও বিবেচনা করা হয়। ফলে যেসব অঞ্চলের প্রয়োজন বেশি, তারা তুলনামূলক বেশি বাজেট বরাদ্দ পায়।
ভারতের জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন এখানে একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। সেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় সীমিত ‘আনটাইড ফান্ড’ দেওয়া হয়, যা তারা জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করতে পারে। এর ফলে ছোটখাটো সংকট মোকাবিলায় প্রতিবার কেন্দ্রীয় অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। অন্যদিকে, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়নের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, দুর্যোগের পরে অর্থ ছাড়ের চেয়ে দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতির জন্য অর্থ ছাড় অনেক বেশি কার্যকর। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলে অর্থায়নও আরও সময়োপযোগী হতে পারে।
এই অভিজ্ঞতাগুলোর মূল শিক্ষা একটিই। তা হলো স্বাস্থ্যখাতের অর্থায়নে একমাত্র সঠিক পদ্ধতি বলে কিছু নেই, সফল দেশগুলোর প্রায় সবাই একটি বিষয় মেনে চলে তা হলো সম্পদ বণ্টনের ভিত্তি হওয়া উচিত ওই এলাকার বা মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে, শুধু অবকাঠামোর আকার নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হতে পারে উপজেলা পর্যায়ে সীমিত আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান করা। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সামান্য ব্যয়র জন্যও একাধিক প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নিয়মতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক সময় গ্রহণযোগ্য হলেও জরুরি পরিস্থিতিতে এটি কার্যকর নয়।
প্রতিটি উপজেলা যদি বছরে কিছু টাকা একটি স্বচ্ছ, নিরীক্ষাযোগ্য এবং স্পষ্ট নীতিমালার আওতাধীন জরুরি তহবিল দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় পর্যায় অনেক সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। হঠাৎ ওষুধ সংকট, জরুরি রেফারেল, অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা, অতিরিক্ত চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহ কিংবা দুর্যোগ-পরবর্তী কোনো জরুরি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এতে কি অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ব না?
এই উদ্বেগ অমূলক নয়। কিন্তু সমাধান স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা। প্রতিটি ব্যয় যদি ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত হয়, নিয়মিত নিরীক্ষা হয় এবং নির্ধারিত সময় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, তাহলে স্বচ্ছতা বজায় রেখেই স্থানীয় পর্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের স্বল্পতা নয়; বরং সীমিত অর্থকে কীভাবে আরও কার্যকর ও ন্যায্যভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই সক্ষমতা।
একইভাবে, জরুরি অনুমোদন প্রক্রিয়াকেও আধুনিক করা জরুরি। বর্তমানে ডিজিটাল বাজেট ব্যবস্থাপনা থাকলেও জরুরি স্বাস্থ্য ব্যয়র জন্য আলাদা দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা নেই। অথচ বিদ্যমান আইবাস++ (iBAS++) প্ল্যাটফর্মেই একটি জরুরি মডিউল যুক্ত করা সম্ভব, যেখানে নির্ধারিত সূচক পূরণ হলেই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে দ্রুত অর্থ ছাড় হবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়র নিয়ন্ত্রণও বজায় থাকবে, আবার অপ্রয়োজনীয় বিলম্বও কমবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের পথে এগোতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ালই হবে না; বরং নিশ্চিত করতে হবে যে অতিরিক্ত বাজেট যেখানে বেশি প্রয়োজন সেখানে নিশ্চিত করা। অন্যথায় বৈষম্য থেকেই যাবে এবং অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফলও পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের স্বল্পতা নয়; বরং সীমিত অর্থকে কীভাবে আরও কার্যকর ও ন্যায্যভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই সক্ষমতা। যদি আমরা বাজেটকে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজনের বিষয়কে যুক্ত করতে পারি, তাহলে একই সম্পদ দিয়েও আরও ভালো স্বাস্থ্য ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
আগামী দিনের বিতর্ক তাই কেবল ‘স্বাস্থ্য বাজেট কত বাড়বে’ এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন হলো, ‘স্বাস্থ্য বাজেট কীভাবে বণ্টন করা হবে?’ কারণ শেষ পর্যন্ত একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে শুধু বেশি অর্থ দিয়ে নয়; বরং সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায় এবং সঠিক মানুষের কাছে সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে।
ড. শাফিউন নাহিন শিমুল
অধ্যাপক ও পরিচালক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়







































আপনার মতামত লিখুন :